দখিনা দর্পণ সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রেজিস্টারি মাঠ – দখিনা দর্পণ
Image

শুক্রবার  •  ৮ বৈশাখ ১৪২৮ • ২১ জানুয়ারী ২০২২

Add 1

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রেজিস্টারি মাঠ

প্রকাশিতঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন । পঠিত হয়েছে ৬৯ বার।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রেজিস্টারি মাঠ

স্মৃতি-বিস্মৃতির সাক্ষী

‘হিংসা ও বিদ্বেষের ওপর কোনো জাতি জগতে টিকিতে পারে না।’ সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রেজিস্টারি মাঠের এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে এমন কথা বলেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেদিন ছিল ১৯৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর। সে জনসভায় তখনকার তুখোড় রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

রেজিস্টারি মাঠের এ জনসভার সংবাদ কয়েক দিন পরে মুদ্রিত হয়েছিল সিলেটের সাপ্তাহিক জনশক্তি পত্রিকায়। এতে বলা হয়, সেদিন রেজিস্টারি মাঠে প্রায় আট হাজার শ্রোতা ছিলেন। দীর্ঘকাল সিলেট শহরে এমন জনসমাবেশ হয়নি বলেও সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

কেবল সেদিনের জনসভাই নয়, এর আগে-পরে বহু সভা-সমাবেশের সাক্ষী সোয়া দুই শ বছরের এই রেজিস্টারি মাঠ। রাজনৈতিক জনসমাবেশের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক-সামাজিক-পেশাজীবী নানা সংগঠনের সভা-সমাবেশও এখানে দীর্ঘকাল ধরে হয়ে আসছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের আগেকার উত্তাল সময়ে মুক্তিকামী বাঙালির নানা অনুষ্ঠানও এ মাঠে হয়েছে। বড় কোনো ধরনের সমাবেশ মানেই রেজিস্টারি মাঠে হবে—এমনটাই সিলেটের ঐতিহ্য হয়েই দাঁড়িয়েছে। কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি-বিস্মৃতির সাক্ষী এই মাঠ। এ মাঠে আয়োজিত সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে হাজারো মানুষের সামনে বক্তৃতা দিয়ে কণ্ঠ পাকিয়েছেন কতশত নেতা-সমাজকর্মী!

গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. আরশ আলী (৭৭) স্মৃতির জাবর কাটলেন এভাবেই, ‘১৯৫৮ সালের দিকে আমি স্থায়ীভাবে সিলেটে বসবাস শুরু করি। ১৯৬০ সালে এমসি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই। সিলেটে আসার পরপরই রেজিস্টারি মাঠে অসংখ্য সভা-সমাবেশ হতে দেখেছি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাবৎ বাঘা নেতার বক্তৃতা এ মাঠেই শুনেছি। পরে নিজেও এখানে কতবার যে বক্তৃতা দিয়েছি, এর হিসাব নেই। আমার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে এ মাঠ কতভাবে যে জড়িয়ে আছে, তা বলে শেষ করা যাবে না।’

তবে ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে হকাররা রেজিস্টারি মাঠের দখল নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন। তখন থেকে কেবল রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হলেই হকাররা সাময়িক সময়ের জন্য মাঠ ছাড়তেন। এরপর থেকে ঐতিহ্যের বিবেচনায় মাঠ দখলমুক্ত করতে নগরবাসী প্রায়ই দাবি উত্থাপন করতেন। তিন দশক পর ২০১৬ সালের ১১ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মধ্যস্থতায় হকাররা স্বেচ্ছায় মাঠ থেকে স্থাপনা অপসারণ ও মালামাল সরিয়ে নেন। এরপর থেকেই মাঠটি দখলমুক্ত আছে। তবে এখনো মাঝেমধ্যে মাঠে কিছু হকার পোশাকের পসরা নিয়ে বসেন।বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠের দক্ষিণ অংশে দাঁড়িয়ে আছে ১৭৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সেমিপাকা আসাম স্থাপত্যের নিদর্শন বহু পুরোনো দৃষ্টিনন্দন জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়। পাশেই আছে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের পাঁচতলা বর্ধিত ভবন। মাঠে ঢুকতে গিয়ে বাঁ দিকে রয়েছে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গণপূর্ত কার্যালয় এবং ডান পাশে আদালতপাড়া। এর মাঝখানে উন্মুক্ত মাঠ। মাঠের ভেতরের অধিকাংশ অংশ গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে মাঠের আয়তন অনেকটাই কমে গেছে। মাঠ, ভবনসহ পুরো স্থানের আয়তন প্রায় ১ একর ৮৯ শতাংশ। মাঠটি সংকুচিত হওয়ায় এখানে এখন কেবল ছোটখাটো সভা-সমাবেশই হয়ে থাকে।

কলাম লেখক রফিকুর রহমান (লজু) সিলেটের ছাত্রসংগঠন ও ছাত্র আন্দোলন: ১৯০৫-১৯৭১ (২০২১) বইয়ে লিখেছেন, ‘জনতাকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ২২ মার্চ (১৯৭১) রেজিস্টারি মাঠে “কলম-তুলি-কণ্ঠ” আয়োজন করে বিশাল গণসংগীতের আসর। সিলেটের নামীদামি মহিলা-পুরুষনির্বিশেষে সকল শিল্পী উন্মুক্ত মঞ্চে গণসংগীতের সুরে কণ্ঠ মেলান।…কবি দিলওয়ারের গীতি–আলেখ্য দুর্জয় বাংলা রেজিস্টারি মাঠের লাখো জনতাকে নতুন চেতনায় জাগিয়ে তোলে। এদিনের চেতনা-উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত হয়ে শিল্পী-সাহিত্যিকেরা পরে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েন।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী মুজিবুর রহমান চৌধুরীর (৮১) রেজিস্টারি মাঠ নিয়ে রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি। তিনি জানান, ১৯৫৩ সালে রেজিস্টারি মাঠে রাজনীতিবিদ এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁদের সফরসঙ্গী ছিলেন। তিনি তখন তাঁদের বক্তৃতা শুনেছেন। এরপর ১৯৫৫ সালে তিনি যখন সিলেটের রাজা জিসি স্কুলের ছাত্র, তখন একই মাঠে তৎকালীন যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শুনেছেন।

আইনজীবী মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘রেজিস্টারি মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে সেদিন মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে আমি মঞ্চের খুব কাছাকাছি ছিলাম। বক্তৃতা শেষে শেখ মুজিব যখন নামবেন, তখন আমরা তাঁকে “স্যার” বলে সম্বোধন করেছিলাম। কিন্তু তিনি তাৎক্ষণিক তাঁকে “মুজিব ভাই” ডাকতে বলেন। মুহূর্তেই তিনি যেন সবার আপন ও প্রিয় মানুষে পরিণত হন। তিনি তখন আমার মাথায় হাতও বুলিয়ে দিয়েছিলেন। এ মাঠ ঘিরে এটাই আমার জীবনের সেরা স্মৃতি।’

এ জাতীয় আরো সংবাদ

স্বাধীনতার ৫০ বছর: ২৫শে মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর যেভাবে এল...

প্রকাশিতঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১০:৫১ অপরাহ্ন

কাদের বিজয় উৎসব করে বাংলাদেশ?

প্রকাশিতঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১:১৮ পূর্বাহ্ন

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রেজিস্টারি মাঠ

প্রকাশিতঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

১৬ ডিসেম্বর: একটি রক্তগোলাপ ফোটার দিন

প্রকাশিতঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১২:২৩ পূর্বাহ্ন

আত্মসমর্পণের সেই মহেন্দ্রক্ষণ

প্রকাশিতঃ ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, বুধবার, ১১:২৯ অপরাহ্ন

তিন লেখকের টার্গেটে গুপ্তচর ‘মাসুদ রানা

প্রকাশিতঃ ১৪ ডিসেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

কবিতার প্রতি তরুণদের অনিহার কারণ কী

প্রকাশিতঃ ৫ ডিসেম্বর ২০২১, রবিবার, ৬:২৮ অপরাহ্ন