দখিনা দর্পণ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস – দখিনা দর্পণ
Image

মঙ্গলবার || ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ || ৯ আগস্ট ২০২২ || ১০ মহর্‌রম ১৪৪৪

Add 1

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস

প্রকাশিতঃ ৯ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহঃ, ৩:৪৭ অপরাহ্ণ । পঠিত হয়েছে ৪৩০ বার।

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস

একসময় শীত আসলেই মায়ের হাতে বানানো হরেক রকমের পিঠা-পুলি খাওয়ার ধুম পড়ে যেত। শীত মৌসুম এলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ বলে খ্যাত ‘খেজুর গাছ’কে ঘিরে জনপদে উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করত। শীত মৌসুমে খেজুর রস দিয়ে তৈরি গুড় পাটালি, পিঠা, পায়েস ইত্যাদি নিয়ে গ্রামবাসীরা অতিথিদের আপ্যায়নে চেষ্টা করত। কিন্তু সেই খেজুরের রসের দানা গুড়, ঝোলা গুড়ের ঘ্রাণ এখন আর গ্রামের হাট বাজারে খুব একটা দেখা যায় না। সবাই শীতের ঐতিহ্য মিষ্টি খেজুরের রসের স্বাদ আজ ভুলতে বসেছে। আগের মত আর বাজারে পাওয়া যায় না সেই আসল খেজুরের পাটালি ও সেই ঘ্রাণ। খেজুরের গুড় হিসাবে যা পাওয়া যায় তার অধিকাংশই এক শ্রেণীর মুনাফাখোর চিনি থেকে তৈরী করে বাজারজাত করে।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও খুলনা জেলা বরাবরই খেজুরগাছ, গুড় ও রসের জন্য বিখ্যাত ছিল। এক সময় অর্থকরী ফসল বলতে খেজুর গুড়ের বেশ কদর ছিল। যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড় পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। যশোরের খেজুরের রস ও গুড় স্বাদে, গন্ধে অতুলনীয়।

সাত আট বছর আগেও শীতকালে এসব এলাকার গাছিরা খেজুর গাছের রস সংগ্রহে খুবই ব্যস্ত সময় কাটাতেন। তারা খেজুরের রস ও পাটালী গুড় বিক্রি করে বিপুল অংকের টাকা আয় করতেন। বিদেশে রপ্তানি করতেন কিন্তু কালের বিবর্তনে বিগত বছরগুলোতে তা ক্রমশ বিলুপ্ত হতে বসেছে। খেজুর রস দিয়ে শীত মৌসুমে পিঠা ও পায়েস তৈরির প্রচলন থাকলেও শীতকালীন খেজুর গাছের রস এখন দুষপ্রাপ্য হয়ে পড়েছে। এজন্য একসময় তীব্র শীতের মাঝেও খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত থাকতেন গাছিরা। গত কয়েক বছরের ব্যবধানে ক্রমবর্ধমান মানুষের বাড়ি-ঘর নির্মাণ আর নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ক্রমেই খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে।

দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামের কিছু কিছু এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত পরিমান খেজুর গাছ থাকলেও সঠিকভাবে তা পরিচর্যা না করা, নতুন করে গাছের চারা রোপণ না করা এবং গাছ কাটার পদ্ধতিগত ভুলের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য খেজুর গাছ মারা যাচ্ছে। এছাড়া এক শ্রেণীর অসাধু ইটভাটার ব্যবসায়ীরা জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহার করার কারণে ক্রমেই কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা।

প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও শীত পড়ার শুরুতেই পেশাদার খেজুর গাছিরা চরম সংকট মোকাবেলা করছে। তারপরেও কিছু কিছু এলাকায় শখের বশত গাছিরা নামেমাত্র খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ওইসব গাছিরা সকাল-বিকেল দুই বেলা রস সংগ্রহ করছে। প্রভাতের শিশির ভেজা ঘাস আর ঘণ কুয়াশার চাঁদর, হেমন্তের শেষে শীতের আগমনের বার্তা জানিয়ে দেয় গাছিদের কর্মতৎপরতা। এক সময় মৌসুমী খেজুর রস দিয়েই গ্রামীণ জনপদে শুরু হতো শীতের আমেজ।

শীতে খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে গাছ কাটে গাছিরা। হেমন্তের শুরুতেই খেজুরগাছ থেকে রস বের করার উপযোগী করে কাটা শুরু হয়। প্রথম গাছ কাটার পর দ্বিতীয়বার চাঁছ দিয়ে সেখানে বসানো হয় কঞ্চির বিশেষভাবে তৈরি নলি বা চোঙ্গা। তার পাশে বাঁশের তৈরি ছোট শলাকা পোঁতা হয় ভাঁড় (কলস) টাঙানোর জন্য। চোখ বেয়ে নলি দিয়ে রস পড়ে ভাঁড়ে। খেজুরগাছ কাটা ও তা থেকে রস বের করার মধ্যেও কিছু কৌশল আছে। যে কেউ ভালো করে গাছ কাটতে কিংবা রস বের করতে পারেন না। কখন, কিভাবে, কোনখানে কেমন করে কাটতে দিতে হবে এবং যার ফলে গাছ মারা যাবে না, অথচ বেশি রস পাওয়া যাবে তা একজন দক্ষ গাছিই ভালোই জানেন। একবার গাছকাটার পর ২-৩ দিন পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়।

শীত যতো বাড়তে থাকে খেঁজুর রসের মিষ্টতাও ততো বাড়ে। শীতের সাথে রয়েছে খেঁজুর রসের এক অপূর্ব যোগাযোগ। এ সময় গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সু-মধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে পুরোদমে শুরু হতো পিঠা, পায়েস ও গুড় পাটালী তৈরীর ধুম। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও বাটালী গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যেতো। খেজুর রসের পায়েস, রসে ভেজা পিঠাসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারেরতো জুড়িই ছিলোনা।

কিন্তু কালের বির্ততনে প্রকৃতি থেকে আজ খেজুরের রস একেবারেই হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রাচীণ বাংলার ঐতিহ্য খেজুর গাছ আর গুড়ের জন্য একসময় দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল বিখ্যাত ছিলো। অনেকে শখের বশে খেজুর গাছকে মধুবৃক্ষ বলে থাকতেন। ঐসময় শীতের মৌসুমে খেজুর রসের নলেন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠতো গ্রামীণ জনপদ।

খেজুর রস দিয়ে গৃহবধূদের সুস্বাদু পায়েস, বিভিন্ন ধরনের রসে ভেজানো পিঠা তৈরির ধুম পড়তো। রসনা তৃপ্তিতে খেজুরের নলেন গুড়ের পাটালির কোন জুড়ি ছিলোনা। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে ঠান্ডা খেজুর রস না খেলে যেন দিনটাই মাটি হয়ে যেতো। কিন্তু ইট ভাটার আগ্রাসনের কারনে আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তাছাড়া, ইটভাটা কিংবা অন্য পেশায় দৈনিক রোজগার বেশি হওয়ায়, খেজুরের গাছালির সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অনেকে চিরতরে বাপ দাদার গাছালি পেশা ছেড়ে দিয়েছে।

ইটভাটায় খেজুর গাছ পোড়ানো আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও ইটভাটার মালিকেরা সবকিছু ম্যানেজ করে ধ্বংস করে চলেছে খেঁজুর গাছ। গত কয়েক বছর ধরে ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছকে ব্যবহার করায় বিভিন্ন এলাকা থেকে দ্রুত খেজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে গ্রাম ও শহরের মানুষ এখন খেজুর রসের মজার মজার খাবার অনেকটাই হারাতে বসেছে।
শখের বসত প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহকারী গাছিদের মতে, আগের মতো খেজুর গাছ না থাকায় এখন আর সেই রমরমা অবস্থা নেই।

ফলে শীতকাল আসলেই অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা গ্রামীণ জনপদের খেজুর গাছের কদর বেড়ে যেত। বর্তমানে এসব অঞ্চলে প্রতি হাড়ি খেজুর রস এক থেকে দেড়’শ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাও চাহিদার তুলনায় খুবই কম। গাছিরা বলেন, খেজুর গাছ রক্ষায় বন বিভাগের কার্যকরী কোন পদক্ষেপ না থাকায় ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে খেজুর গাছ আর শীতের মৌসুমে খেজুর গাছের রস শুধু আরব্য উপনাস্যের গল্পে পরিনত হতে চলেছে।

স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা ও কঠোর নজরদারীর অভাবে ইটের ভাটায় অবাধে খেজুরগাছসহ ফলবান বৃক্ষ পোড়ানোর কারণে খেজুর বৃক্ষের বিরাট অংশ উজার হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়তো খেজুর রসের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। খেজুরের রসের পিঠা পায়েশ এখন শুধুই স্মৃতির রোমন্থন।

ঐতিহ্যবাহী এ খেঁজুর রসের উৎপাদন বাড়াতে হলে টিকিয়ে রাখতে হবে খেজুর গাছের অস্তিত্ব। আর সে জন্য যথাযথ ভাবে পরিবেশ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ইটভাটাসহ যেকোন বৃক্ষ নিধনকারীদের হাত থেকে খেঁজুর গাছ রক্ষা করতে হবে। অবশ্য সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু এলাকায় কৃষি বিভাগ থেকেও কৃষকদের খেজুর গাছ লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তার পার্শের পরিত্যক্তস্থানে কৃষকেরা পর্যাপ্ত পরিমান খেজুর গাছ রোপন করলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে খেজুরের রস ও গুড়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

একসময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশে খেজুরের গুড় রফতানি হতো। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বেশি বেশি খেজুর গাছ রোপণ করা প্রয়োজন এবং গাছালীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খেজুরের রসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা দরকার।

লেখক: শ্যামল শীল,ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

Follow Essay Format Information From An Experienced Instructor

Follow Essay Format Information From An Experienced Instructor

প্রকাশিতঃ ৭ আগস্ট ২০২২, রবি, ৩:২৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে তেলের দামের নজিরবিহীন বৃদ্ধির আসল কারণ কী

প্রকাশিতঃ ৬ আগস্ট ২০২২, শনি, ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

বৃষ্টি হতে পারে টানা ৩ দিন

প্রকাশিতঃ ৪ আগস্ট ২০২২, বৃহঃ, ৯:৪১ অপরাহ্ণ

ছাত্রদল সভাপতির মৃত্যুতে ভোলায় বিএনপির সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

প্রকাশিতঃ ৪ আগস্ট ২০২২, বৃহঃ, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

নির্বাচন সামনে রেখে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ ৪ আগস্ট ২০২২, বৃহঃ, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

আদমশুমারি: বাংলাদেশে জন্মহার কমা ভালো নাকি খারাপ?

প্রকাশিতঃ ২৯ জুলাই ২০২২, শুক্র, ১০:৩২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামে ট্রেন-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নিহত ১১

প্রকাশিতঃ ২৯ জুলাই ২০২২, শুক্র, ১০:১০ অপরাহ্ণ